চরমপন্থার ছায়ায় বাংলাদেশ: ইতিহাস, বিতর্ক ও উদ্বেগ
বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের গল্পটা আসলে কেমন?
ইতিহাসের একটু পেছনে ফেরা যাক; সালটা ১৯৭৫। বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক মহাকাব্যের বেদনাবিধুর পরিসমাপ্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের আকস্মিকতায় পুরো জাতি স্তব্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরবর্তী বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে আসীন একজন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। এরপরই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যে রাজনৈতিক দর্শন, সেটি দেশের মানুষের কাছে প্রকাশিত হয় তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।
১৯৭৬ সালের ৪ মে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের বিধিনিষেধ বাতিল করা হয়, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠন ও বাংলাদেশে মৌলবাদীদের রাজনীতিতে ফেরার বৈধতা প্রদান করে। জামায়াতে ইসলামির মতো মওদুদীবাদী আকিদার মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও সাংবিধানিক ভিত্তি দৃঢ় হয় ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থীদের সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে, নগ্নভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সামরিক ফরমান জারির ফলে। এমন পদক্ষেপ থেকে এটি স্পষ্ট করে যে ধর্মীয়, রাজনৈতিক কিংবা আদর্শগত কারণেই “President Ziaur Rahman was a major originator of militancy, fundamentalism, and extremist ideology in Bangladesh.”
জৈবিক, আদর্শিক এবং জিয়াউর রহমানের নিষিদ্ধ বীর্যে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বিচরণ সামগ্রিকভাবেই উদ্বেগের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মতো অসংখ্য জঙ্গি সংগঠনকে ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়। ‘মার্চ ফর খিলাফত’ কর্মসূচি দিতেও দেখা যায়। যেখানে ৭ মার্চ ২০২৫ বায়তুল মোকাররম এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটে। কিন্তু দেশে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার পেছনে এবং এদের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি ও মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বেশ পুরোনো।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যদিও সরাসরি জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে বাংলাদেশের আদালত জঙ্গিবাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল। ২০০১-২০০৬ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ও হুজি (হরকাতুল জিহাদ)-এর মতো জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে তারেক রহমানের সখ্যতা ছিল। রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরালে ছিল তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবন। যেখান থেকে তিনি এ জঙ্গি নেটওয়ার্ক স্থাপন ও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো সহিংস হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন। তদন্ত সংস্থা, সম্পূরক চার্জশিট ও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে হামলার পূর্বে জঙ্গি সংগঠন (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের সঙ্গে হাওয়া ভবনে একাধিক বৈঠক ও জঙ্গি হামলার বিষয়ে পরিকল্পনার কথা। যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেশের নাগরিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক ও সংশয় তৈরি করেছে।
এ ছাড়াও দেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় জঙ্গিবাদের আরেক পৃষ্ঠপোষক মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামী। যার সাংসদরা ইতোমধ্যে দেশে শরিয়াহ আইনের বাস্তবায়ন করতে চায়। দলটি নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে সকল ইসলামপন্থীদের নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে জিহাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ইসলাম ধর্মের আদর্শে বিশ্বাসী এ গোষ্ঠীর সদস্যরা তালেবানী রাষ্ট্রের আদলে বাংলাদেশকে পরিণত করতে চায়। যেখানে চরমপন্থাই শেষ কথা। সেখানে আজকের বর্তমান সংসদে মুক্তমত প্রকাশের জন্য এমপি হানজালার মত তালেবানী ইসলামপন্থীরা ইসলাম ধর্মের প্রচারক নবী মুহাম্মদকে নিয়ে যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা কিংবা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবী জানাচ্ছে।
দেশ কি তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে?
মৌলবাদীদের সঙ্গে বিএনপির অন্তরঙ্গতার এমন চিত্র বেশ নগ্ন। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও রাজনৈতিক সখ্যতায় জড়ান এ শ্রেণির সঙ্গে। যা একজন জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে আমাকে মর্মাহত করেছে। নিজ স্বামীর দেখানো পথেই নিজের রাজনৈতিক দর্শনকে এ মৌলবাদীদের কাছে সমর্পণ করেন।
গোলাম আজম, আল্লামা সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামীর মতো ৭১-এর ধর্ষকদের নিজে রাজনীতিতে জায়গা করে দেন ১৯৯৯ সালে বিএনপি চারদলীয় জোটে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের মধ্য দিয়ে।
এরপর জলঘড়ির সময় গড়িয়েছে অনেক দূর। প্রয়াত বিধবা খালেদা জিয়া মৌলবাদীদের এড়াতে পারেননি কখনোই। খালেদা জিয়া ২০০১-২০০৬ সালে এসব চিহ্নিত মানবতাবিরোধী, উগ্রবাদী জঙ্গিদের গাড়িতে তুলে দেন বাংলাদেশের পতাকা, অনেকটা বেখেয়ালেই। যা নিয়ে দলটির উদারপন্থী রাজনীতিকদের উত্তেজনা ও সমালোচনা ছিল দলের ভেতরে-বাইরে।
উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার উন্মেষ ও আস্ফালনের বর্তমান এ ক্রান্তিকালীন সময়ে; যখন দেশের প্রধান ও বিরোধী দুটো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই জঙ্গিবাদের স্পষ্ট অভিযোগ। এ প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক;
আমরা কোথায় যাব?
আমাদের এখন কী হবে?
আমরা কার কাছে যাব?






