২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ দেড় দশকের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয় একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু গণতন্ত্র উত্তরণের পথের অভিযাত্রায় রাষ্ট্রের পরবর্তী দৃশ্যপটে উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে ইসলামিক রাষ্ট্র, জিহাদ, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পুনরুত্থান।
বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সারা দেশে জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত প্রায় তিনশতাধিক আসামি মুক্তি পেয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর শাসনামলে। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন এবং ঝুঁকি তৈরি করেছে।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ইসলামিক এক্সট্রিমিস্ট অর্গানাইজেশন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশের ছায়া সরকার হিসেবে একচ্ছত্রভাবে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা গিয়েছে। যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। এবং দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ইসলামী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দলটির বিরুদ্ধে অতীতে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বহু পুরনো এবং প্রমাণিত সত্য।
এদিকে, জঙ্গি তৎপরতার মদদদাতা এবং পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ২০০১–২০০৬ শাসনামলে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংশ্লিষ্টতা বর্তমান শাসনামলে দেশের জনগণের জন্যও বেশ স্পর্শকাতর একটি পরিবেশ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক অধ্যায়। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। গুরুতর আহত হন শেখ হাসিনা।
এই মামলার রায়ে তারেক রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ-এর জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান-এর জবানবন্দি এবং ঘটনার পূর্বে দেশের এই জঙ্গিদের সঙ্গে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এবং এই জঙ্গি হামলার পেছনে তারেক রহমান উচ্চপর্যায়ের নির্দেশদাতা ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এমন বাস্তবতায়, জঙ্গিবাদপ্রেমী বিএনপি-শাসিত তারেক রহমানের বর্তমান শাসনামলে জঙ্গিবাদ এবং উগ্রবাদ স্বাধীনতা উপভোগ করবে—এমনটাই কি প্রত্যাশিত নয়? যেখানে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার অভিযোগে হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও হিযবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ, জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-এর মতো জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো, এবং এসব সংগঠনের পেছনে শক্তি যোগিয়েছে মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। এসব জঙ্গিবাদী সংগঠনের সদস্যদের জামায়াতে ইসলামীর ছত্রছায়ায় এক ধরনের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করতে দেখা গেছে, যা এখনও অব্যাহত আছে—শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি প্রি-অকুপায়েড উইথ দ্য এস্টাবলিশমেন্ট অব এক্সট্রিমিস্ট ইসলামিক দল জাতীয় সংসদে জায়গা করে নেওয়া।
দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব জঙ্গি সংগঠনের লোকদের উপস্থিতি দেখা গেছে কলেমা-খচিত কালো পতাকা সহ বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে। যা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
এদিকে, জামায়াত জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণ রাজনৈতিক দল এনসিপি। কিন্তু দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বেশিরভাগই জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—বাংলাদেশ কি নতুন করে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের দিকে এগোচ্ছে?
দেশের এমন বাস্তবতায় নতুন করে জঙ্গি তৎপরতা ও এক্সট্রিমিস্ট কার্যক্রম মাথাচাড়া দেওয়ার পথেই হাঁটছে। রেডিক্যাল ফোর্স হিসেবে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা এক্সট্রিমিস্ট এবং ফান্ডামেন্টালিস্ট পার্টি জামায়াতে ইসলামী নিউরণের ভূমিকায় থেকে জঙ্গিবাদের দাওয়াত পৌঁছালে, সেটিকে মোকাবেলায় একই নেটওয়ার্ক এবং অভিযোগে অভিযুক্ত এক সময়ের জামায়াত-বিএনপি জোট—যা দেশের বর্তমান জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল হিসেবে—বর্তমান বাংলাদেশকে যদি অস্থিতিশীল করে তোলে এবং জঙ্গি নেটওয়ার্কের নবায়ন করে, যদি কার্যক্রমের নতুন সনদ প্রদান করে; তবে বর্তমান বাংলাদেশ কি একটি সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন রয়েই যায়।
অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক জোটগুলো পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই জটিল ও সংবেদনশীল।
