ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন
নারীকে পর্দার অন্তরালে রাখার প্রথা এবং নারীর পোশাক, শরীর ও চলাফেরার ওপর ধর্ম ইসলামের নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস দীর্ঘ। ধর্মচর্চার অংশ হিসেবে নারীর প্রতি হিজাববিধি, নারী-জীবন-স্বাধীনতার প্রশ্ন, কোরআন ও শরিয়াহ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও নারীদের পশ্চাৎপদ ও অবদমিত করে রাখা হয়। একান্নবর্তী পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় এখানে নারী শুধুমাত্র ধর্মচর্চার অংশ হিসেবেই থেকেছে।
আজ আফগানিস্তানে তালেবানের শাসন, ইরানের রাষ্ট্রীয় পোশাকনীতি কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার উত্থান—সবকিছুই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে: নারীর পোশাক ও জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত কি রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নির্ধারণ করবে, নাকি সেই সিদ্ধান্ত নারীর নিজের?
বাংলাদেশেও এই প্রশ্ন ক্রমশ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে। ধর্মীয় রক্ষণশীল ও মৌলবাদী রাজনীতির একটি অংশ নারীর পোশাক, চলাফেরা ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে নির্দিষ্ট বিধিবিধান প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসদীয় রাজনীতিতেও ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি।
সম্প্রতি বিএনপির এক সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলেছেন—‘আপনারা কারা? আপনাদের তো আমরা চিনি না।’ তাঁর বক্তব্যে জামায়াতের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
বলে রাখা দরকার, এখানে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে: একজন নারীকে আমরা তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, কাজ ও নাগরিক পরিচয়ের মাধ্যমে বিচার করব, নাকি তাঁর পোশাক ও ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে? কিন্তু এই ধর্ম ইসলাম কি নারীদের প্রতি সদাচরণ দেখায়? এর উত্তর বেশ স্পষ্ট, দেখায় না।
নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীর ঢেকে রাখা, নির্দিষ্ট পোশাক পরা কিংবা জনপরিসরে নারীর চলাচল সীমিত করার প্রবণতার সমালোচনা করার জায়গা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই সমালোচনা যেন নারীকে আবারও তার নিজের পছন্দের অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। একজন নারী হিজাব বা বোরকা পরবেন কি না—সেটি যেমন তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন, তেমনি তিনি তা পরতে চান না—সেটিও তাঁর সমান গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুশীলনকে বাধ্যতামূলক সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় বিধানে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়। নারীর পোশাককে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ যেমন স্বাধীনতার পরিপন্থী হতে পারে, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নারীকে অপমান বা অবজ্ঞা করাও সমানভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী।
নারীকে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে রক্ষা করার জন্যই হিজাব বা বোরকার উদ্ভব।
তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি: কেন নারীর শরীর, চুল, পোশাক ও যৌনতা নিয়ে সমাজে এত বেশি নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা রয়েছে?
এই প্রশ্ন শুধু ইসলামের ক্ষেত্রেই প্রবল। কোনো ধর্মীয় বিধান যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের ইচ্ছায় পালন করেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু একই বিধান যদি রাষ্ট্র, পরিবার, ধর্মীয় গোষ্ঠী কিংবা সামাজিক চাপের মাধ্যমে তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেটি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে পরিণত হয়।
নারীর স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তাই শুধু ‘নারী কী পরবে’ সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—নারী নিজের শরীর, পোশাক, শিক্ষা, কর্মজীবন, বিবাহ, সম্পর্ক ও জীবনযাপন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কি না।
ধর্মের সমালোচনা করা যাবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মৌলবাদী রাজনীতির সমালোচনাও করা যাবে।
কিন্তু কেন শুধুমাত্র ইসলাম ও মুসলমানেরাই নারীদের প্রতি এতটা বিদ্বেষী?
কেন নারীদের নিয়ে ধর্মপাল মুসলমানের এত উন্মাদনা?
আল্লাহ শব্দের অর্থ হলো যৌন প্রলোভনকারী। ইসলাম শব্দের বাস্তবিক পরিভাষা হলো যৌন উন্মাদনা। অর্থাৎ যে আল্লাহর যৌন প্রলোভনে যৌন উন্মাদ হয়েছে, সেই হলো ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
প্রাক-ইসলামী যুগে আরবের মুসলমানরা অর্থাৎ নবী মুহাম্মদের সাহাবীরা একে অপরের স্ত্রী-কন্যাদের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়াত। ধর্ম ইসলাম ও কোরআনে কল্পিত বেহেশতে পুণ্যবতী নারী ও হুরগণের এমন সব শারীরিক এবং যৌনতার বর্ণনা রয়েছে, যা মুসলমানদের নারীদের শরীরের প্রতি প্ররোচিত করত।
সাহাবীরা নবী মুহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করে, কীভাবে তাঁরা তাঁদের স্ত্রী-কন্যাদের রক্ষা করবে?
তখন নবী তাঁর সাহাবী ও অনুসারীদের বলেন, তোমাদের (স্ত্রী, কন্যাদের) পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাখবে। তাদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখবে। নবী মুহাম্মদসহ তাঁর অনুসারীদের অবৈধ উন্মাদনা থেকে পরিত্রাণ দিতেই মুসলিম নারীদের বোরকা ও হিজাবের মতো পর্দাপ্রথার উদ্ভব হয় ইসলামে।






